শিল্পগুরু সফিউদ্দিন স্মরণে ছাপচিত্র প্রদর্শনী

অনুষ্ঠিত প্রদর্শনীর কিছু ছবি

করোনার প্রভাব এখনও দাপিয়ে বেড়াচ্ছে চারদিক। বাংলাদেশ যার বাইরে নয়।সকল স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্য একটি জায়গায় স্থির হয়ে আছে। কিন্তু থেমে নেই শিল্পপ্রেমীদের শিল্পচর্চা। কারণ, শিল্পীরা কখনো থেমে থাকতে শেখেনি। কোন না কোনভাবে দুঃসহ সময়ের মধ্যদিয়ে হলেও চর্চা কে চলমান রেখে শিল্পসাধনা চালিয়ে গেছেন। হয়তো এসেছে হঠাৎ স্হবিরতা কিন্তু থেমে যাওয়া হয়না শিল্পীদের। তারই রেশ পাওয়া যায় গত ২৩শে জুন ২০২১ থেকে শুরু হওয়া, শিল্পগুরু শফিউদ্দিন আহমেদের ৯৯তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত ছাপচিত্র প্রদর্শনীতে।

শেওলা ধরা দেয়ালে পাতারা খেলছে, নুয়ে পরছে নিচের দিকে বেড়ে উঠার এক প্রয়াস। নুসরাত জাহানের এচিং মাধ্যমে করা কাজটিতে রং এর ব্যবহারে পুরনো আর নতুনের মেলবন্ধন। কথোপকথনে যোগাযোগ, প্রকৃতির মতো মিশে থেকে, জড়িয়ে বেঁচে থাকা। প্রসারিত হতে, ছড়িয়ে দিতে যে কোনভাবে চাইলেই যে কোন কিছুই আঁকড়ে ধরে বেড়ে উঠা যায়। অস্মিতা আলমের কাজে সাদা-কালোর মেলবন্ধনে বিন্যাস হয়েছে প্রকৃতি আর প্রযুক্তি। অন্যদিকে আমরাই ভাঙি, আবার আমরাই গড়ি। সভ্যতাকে নতুন রূপ দিতে কিছু পুরোনোকে না চাইলেও অনেক সময় ধ্বংস করে গড়তে হয়, সামন্য মুখের একটা শব্দে বা হাতের ইশারায়, উডকাট মাধ্যমে করা আবিরের কাজের বার্তা।

চাকার উপর নির্ভর করে চলে লাখো মানুষের সংসার। সে জীবনের চাকাই হোক বা জীবন বয়ে নিয়ে যাওয়ার চাকা, সাদেক আহমেদ’র এচিং মাধ্যমের এ কাজটিতে রয়েছে ভিন্নমাত্রার পেলবতা। ঝোটন চন্দ্র রয়’ র ফুলেল সুষমায় জিংক প্লেটেও ফুটে উঠেছে জলরং এর ছোয়া। সাদা-কালোর আবহে জীবন চলে, প্রবাহিত হয়, সে যান বা জীবন। ফাওয়াজ রব’র একটি প্রান্ত থেকে শুরু করে, গন্তব্যে ফিরে যাওয়ার আবহ দৃশ্যমান। নিঃসঙ্গ জীবন এর একাকিত্ব, নির্জনতার সঙ্গী- পুরো আঙ্গিকে পাখির উপস্থিতিতে ফুটিয়ে তুলেছেন চিত্রন সাহা। শান্তিনিকেতনের সাঁওতাল পরিবারের জীবনচিত্র ফুটে উঠেছে লাইম স্টোনের তুষের ওয়াশে। রফিকুল ইসলামের শান্তিনিকেতনের অধ্যয়ন সময়ের প্রেক্ষাপট ফুটে উঠেছে তার কাজে।

জলরাশির মতো অন্ধকারের মাঝেও সুদূরে একটুখানি আলো আরও জলে আলোর প্রতিচ্ছবি আশাজাগানিয়া কাজ করায়, যা দারুণভাবে চিত্রায়িত হয়েছে জান্নাতুন জান্নাতের কাজে। শিল্পীর তুলিতে প্রেম মিশে গেলে জড় বস্তুও প্রাণ পায় ক্যানভাসে। তেমনি প্রাণ পেয়েছে দিশারীর প্লেট। আলো ছায়ার খেলা, সাথে তলের বিভাজনও যেন সতেজ ফল ক্যাপসিকাম। অন্যদিকে জলে ঢেউ খেলানো প্রতিচ্ছবির প্রতিরূপ পাই সুমনার উডকাঠের কাজে। বিমূর্ততার মধ্যেও রং এর খেলা ভিন্ন আঙ্গিক তৈরি করেছে। বৃত্তের মধ্যে

আবদ্ধ থেকেও বিভিন্ন ভাবনা চিন্তা-আকার এর এক অনিশ্চয়তার বহিঃপ্রকাশ, কিছু বলতে চাওয়া, যেন আবদ্ধ থেকেও আবদ্ধ নয় – এমন চিত্রের প্রকাশ সামিয়া আহমেদের ছাপাইছবিতে। রিয়ার কাজেও অনেকটা একিভাবেই স্বপ্ন জিইয়ে রাখার আভাস, এনগ্রেভিং এর প্রতিটি লাইন গ্যারেজে কাজ করা কিছু তরুণ প্রাণের ক্ষত-অক্ষত স্বপ্নকে প্রতিদিনকার  জীবন সংগ্রামে পূরণের ধাপ। ফটো এ্যাচিং আর একুয়াটিন্ট এ কিছুটা একই দৃশ্যের প্রভাত, সাথে ব্যাকড্রপ হিসেবে এসেছে কলকাতার ধর্মীয় রিচ্যুয়াল বা সংস্কৃতির ছোঁয়া।

ঐতিহ্যের একটি আলাদা সৌন্দর্য রয়েছে, যা সুস্মিতা বড়ুয়া তার চট্টগ্রাম জেলার সাম্পান নৌকার উপস্থাপনে ফুটিয়ে তুলেছেন, আবার অন্যদিকে দীর্ঘ সময় ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থান আর সাথে পুরুলিয়ার বিখ্যাত ছৌঁ নাচকে প্রতিকী হিসেবে দেখিয়েছেন মুখোশের মাধ্যমে।

উডকাঠের প্রতিটি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম লাইনের ব্যবহার, ধাপে ধাপে একটি রং এর ব্যবহারের পর আরেকটি ২য় ধাপে রং এর ব্যবহারের যে রঙিন পেলবতা, স্বতঃস্ফূর্ততা আর শৈলীর প্রভাব তা পাই উডকাট ছাপচিত্রে। কাপড়ের ভাজে ভাজে শরীরী সৌন্দর্য, আলো ছায়ার খেলা সাথে নাটকীয় আলো ছায়ার খেলা পাই ফখরুল ইসলাম মজুমদার শাকিলের উডকাট চিত্রে। লাল সবুজ রং’র আবহে দেশ মাতৃকার সাথে মোঃ আশরাফুল রানা’র শিল্পীশৈলীর উপস্থাপনা উডকাট মাধ্যমে এনেছে ভিনমাত্রা। নিজেকে উপস্হাপন করে নিজস্ব ভাবনা চিন্তার বহিঃপ্রকাশ পেয়েছে মোঃ শাহেদ হোসাইন এর কাজে।

প্রর্দশনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান প্রাণ পেয়েছে অধ্যাপক নিসার হোসেন, অধ্যাপক রশিদ আমিন, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, শিল্পী শেখ মোহাম্মদ রোকনুজ্জামান, আহমেদ নাজির খোকন সহ বিশিষ্ট শিল্পী ও শিল্পরসিকদের পদচারণায়।

শিল্প বাঁচুক ভালোবাসায়, প্রাণের স্পন্দনে। জাগরূক হবে শিল্পালয়, শিল্পের প্রতিটি অঙ্গন। স্থবির সময় প্রান পাবে, প্রানবায়ু সঞ্চার করবে প্রতিটি শিল্পপিপাসুর মনে।

– সুস্মিতা বড়ুয়া

স্বাধীন গবেষক

রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত।

Write Art Blog In our Website-Message on Facebook Page.